আত্মহত্যাই জীবনের সবচেয়ে বড় কাপুরুষতার পরিচয়






কোন প্রাণী যখন স্বেচ্ছায় নিজের জীবনকে বিপন্ন করে অর্থাৎ এমন কোন কর্মের মাধ্যমে নিজেই নিজের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায় তখন সে প্রাণীর ঐরূপ কর্মকে আত্মহত্যা বলা হয়।

আত্মহত্যা মানুষ কেন করে, তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে, হচ্ছে। আশির দশক পর্যন্ত চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা মনে করতেন, গভীর বিষণ্নতা এবং অন্যান্য মানসিকরোগ, যেমন সিজোফ্রেনিয়া, বাই-পোলার, মুড ডিজর্ডার ইত্যাদির সঙ্গেই শুধু আত্মহত্যা জড়িত। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, প্রায় ১০ শতাংশ আত্মহত্যার ক্ষেত্রে কোনো রকমের মানসিক রোগ জড়িত ছিল না। শুধু তা-ই নয়, আত্মহত্যার রোগীদের মস্তিষ্কের গঠন এবং স্নায়ুতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত রাসায়নিক পদার্থ এগুলোর মধ্যেও পার্থক্য পাওয়া যাচ্ছে একজন সাধারণ সুস্থ মানুষের তুলনায়। বিজ্ঞানীরা আরও খুঁজে পেয়েছেন জিনেটিক বা বংশগতির সূত্র। প্রায় ১৫-১৬ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে এই বংশগতির বা জিনেটিকের যোগসূত্র একেবারে প্রমাণিত। সেই সঙ্গে সামাজিক, পরিবেশগত কারণ এবং অন্যান্য ঝুঁকি মিলিয়ে একজন মানুষ আত্মহত্যা করে।
জীবনটা নিজের হলেও আত্মহত্যার মাধ্যমে এ জীবন নষ্ট করার অধিকার কারো নেই। তথাপি মাঝে মাঝে মানুষ আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়। আত্মহত্যার পেছনে লিঙ্গ, বিবাহ, ধর্ম, বসবাসের অবস্থান, অর্থনৈতিক অবস্থা, সামাজিক নৈরাজ্যকে তিনি সামনে আনেন। অপরাধ বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিকোণ থেকে ‘আত্মহত্যা’ কার্যক্রমটি এক ধরনের অপরাধ। এ ধরনের অপরাধকে আমরা ‘ভিকটিমলেস ক্রাইম’ বলে চিহ্নিত করি, যেখানে আত্মহত্যাকারী নিজেই অপরাধী ও ভিকটিম।

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আত্মহত্যা মহাপাপ। নেপোলিয়নের মতে, আত্মহত্যাই জীবনের সবচেয়ে বড় কাপুরুষতার পরিচয়। সেন্ট অগাষ্টিনের অভিমত হলো, আত্মহত্যাঅন্যায় ও নিকৃষ্ট কাজ। জীবনের অকল্যাণ থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রচেষ্টায় নিকৃষ্ট কাজ আত্মহত্যা। দার্শনিক কান্ট মনে করতেন, আত্মহত্যা অন্যায় কাজ। কেননা, আত্মহত্যা মানবতার আদর্শের পরিপন্থি, আত্মহত্যার বেলায় মানুষ তার মনুষ্যত্বের অমর্যাদা করে। সুনীল কুমার নাগের মতে, আত্মহত্যা নীতির চোখে অন্যায়, আইনে অপরাধ।

আত্মহত্যা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়, আত্মহত্যা কোনো ব্যক্তির অধিকার হতে পারে না। আত্মহত্যায় কোনো পৌরষত্ব বা বীরত্ব নেই, আছে কাপুরুষোচিত বর্বরতা আর অনৈতিক আত্মগ্লানির বহিঃপ্রকাশ। আত্মহত্যা কেন করে এর সঠিক কারণ সনাক্তপূর্বক এ থেকে উত্তরণের জন্য মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সিলিং এর পাশাপাশি ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এর কুফল বর্ণনাসহ সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।